Thursday, November 5, 2026

দুঃসহ সেই প্যান্ডেমিকের দিনগুলো

 করোনাভাইরাস।। মহামারী।। নোবেল করোনা ভাইরাস।।

সৃষ্টিকর্তার সাথে আমাদের সম্পর্ক অটল, নিরবিচ্ছিন্ন। কিন্তু পৃথিবীর গোলক ধাধায় আর বস্তুবাদের চেতনায় আমার ইহলৌকিক ও পারলৌকিকতার পার্থক্য বুঝতে পারি না। জীবন বরাবরই পার্থিব ভাবনায় বিভোর, আর বিপদ, মানুষের করুণ পরিণতি এবং মৃত্যু পরপারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।


এটা আমার গল্প, তৎকালীন সময়ে আমার মতো এমন লাখো মানুষের লাখো কোটি দুর্দশা-আর দুর্গমতার গল্প রয়েছে। ২০২০খ্রি. নোবেল করোনা ভাইরাস নামে চীন দেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরে। আমাদের দেশেও তা বিদ্যুৎবেগে বাতাসের সাথে মিশে যায়। 

বাংলাদেশে ২০১৯ সালের শেষের দিকে কিছুটা মৃদু প্রবাহ আর অল্প-স্বল্প নিউজ হলেও ২০২০ এর শুরুর দিকে জোরালে ভাবে চলছিল করোনা ভাইরাসের বিষয় সকল প্রচার প্রচারণা। প্রথম দিকে আমরা কেউ বিষয়টাাে পাত্তা না দিলেও ২০২০ এর মাঝামাঝি  এসে আর উপেক্ষা করার উপায় ছিল না। 

আমার গল্পের শুরু এখানেই, জান্নাতুন নাঈমা অপি, আমার রাজ্যহীন রাজকন্যা আল্লাহ প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ উপহার। ২রা ফেব্রুয়ারি ২০২০ আমার ঘর আলোকিত করে পৃথিবীতে আসে। আমি বিডিজবস ডট কম নামে একটা কোম্পানিতে সিনিয়র কন্টেন্ট ডেভেলপার হিসাবে কর্মরত ছিলাম। মেয়ে হবার সুবাদে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসি। আমার মেয়ে হসপিটালে  জন্মগ্রহণ করে। তারপর টানা ৭ দিন হসপিটালে থাকতে হয়। তখন চারিদিকে করোনার মহামারী প্রকোপ বাড়তে থাকে। নবাগত সন্তানকে নিয়ে এবং তার আমাকে নিয়ে  চিকিৎসা এবং নানা দৌড় জাপ করতে করতেনআমি প্রায়  ক্লান্ত। সপ্তাহ খানেক অফিসে  ডিউটি করলাম, এরই মাঝে আমার শরীর হঠাৎ করে খারাপ করতে শুরু করল। সারা শরীর,,চোখ হলুদ হয়ে আসলো।  খাবারের রুচি চলে গেল এবং দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিলাম। কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করলাম হসপিটালে গিয়ে। পরীক্ষায় রিপোর্ট পেয়ে  জানতে পারলাম আমার জন্ডিস হয়েছে। 

এদিকে করুনার  দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে বিভিন্ন হসপিটালে রোগীদের আনাগোনা কমে যাচ্ছে। ডাক্তাররাও  নিরাপদ দূরত্বে থেকে রোগী দেখা শুরু করলেন। হসপিটাল গুলোতে  ডাক্তার দেখানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ল। কিন্তু কিছুই করার নেই,করুনার  মহামারীর জন্য সকল অফিসে হুম কোয়ারেন্টাইন দিয়ে দিলো। যেহেতু আমি জন্ডিসের আক্রান্ত অফিস থেকে  এক মাসের ছুটি নিয়েছিলাম। এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই করুণার ওয়ার ফ্রম হোম শুরু হয়ে গেল। ছুটিতে থাকা সত্ত্বেও  আমি অফিসে নোটিশ দিলাম যে বাসা থেকে   কাজ করতে পারবো।

একদিকে আমার সন্তান যেমন খোদাতালার আশীর্বাদ, অন্যদিকে সারা পৃথিবীতে করুণা মহামারী যেন অভিশাপ হয়ে নেমে আসলো  এবং হঠাৎ করে আমার জন্ডিস রোগে আক্রান্ত হওয়া, চাকরিতে বেতন কমে যাওয়া ও করোনার কারনে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া। সব মিলিয়ে একটি নাজেহাল অবস্থায় পড়ে গেলাম। টাকার অভাবে বাচ্চার মাকে ভালো কোন ফলমূল ও খাবারদাবার কিনে খাওয়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ল এবং নিজের চিকিৎসা ও খাবার-দাবার খাওয়ার  টাকাও তেমন ছিল না। অনেক কঠিন পরীক্ষার মধ্যে পড়ে গেলাম আর আত্মীয়-স্বজন আপনজনেরা প্রত্যেকেই সেই কঠিন সময়ে   আমার পর হতে শুরু করল। প্রত্যেকে যেন আমার পরিচয় না দিতে পারলে বেঁচে যায় এমন পরিস্থিথিতে কেটে গেল তিন থেকে চার মাস।  

আমার ছোটবেলার বন্ধু মোমেন,যে কিনা ছোটবেলা থেকে শ্রেষ্ঠ বন্ধু হয়েছিল। আমার খুব কঠিন সময়ে তার কাছে সামান্য কিছু টাকা  হাওলাত চেয়েছিলাম কিন্তু তার অঢেল টাকা থাকা সত্ত্বেও আমাকে সামান্য ৫০০০ টাকা হাওলাত দেয়নি। নানা অজুহাত এবং কিচ্ছা কাহিনী শুনিয়ে মিছে সান্তনা দিয়েছে। মন খারাপ হয়নি, বাস্তবতা আর সময়ের পরীক্ষায় আমি খুব দারুন ভাবে নিজেকে ঝালিয় নিচ্ছিলাম। 

সেই বিপদের দিনে একমাত্র আমার মা এবং আমার স্ত্রী আমার পাশে ছিল। ভাবনা চিন্তার কঠিন বেড়াজালে আমি আবদ্ধ হয়ে গেলাম। একদিকে আমার সন্তান, অন্যদিকে আমার জন্ডিস, করোনার ভয়, পরস্পর বিচ্ছিন্নতা, প্রত্যেকে নিজেদের ঘরে  আলাদা আলাদা থাকতে শুরু করলাম। মানুষ মানুষের সাথে মেশা বন্ধ করে দিচ্ছিল। রাস্তাঘাটে, হাটবাজারে এবং গাড়িতে বিভিন্ন স্থানে সরকারি অনেক বিধি নিষেধ মেনে চলতে হতো।  মাস্ক ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া যেত না। তবে আল্লাহর রহমত হতে আল্লাহ আমাকে বঞ্চিত করেননি আমি ধীরে ধীরে  সুস্থ হতে শুরু করলাম  কিন্তু আল্লাহ আমাকে আমার মায়ের ভালোবাসা থেকে চিরতরে দূরে সরিয়ে দিলেন। একটার পর একটা সময়ের কঠোরতা যখন আমায় প্রান্ত করে দিচ্ছিল, তখন আল্লাহ হয়তো সেই করোনার ছোবলে ব্রেন স্টোক এর  উসিলায় আমার মা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে তার আসল ঠিকানায় পাড়ি জমায়। আল্লাহ তায়ালা যেন আমার গর্ভধারিনী  মাকে বেহেস্তের উচ্চ স্থানে ঢাকায় করেন আমিন। 

২রা জুন ২০২০ আমার আম্মা আমাদের ছেড়ে  আল্লাহ জিম্মায় চলে যান। আমার জীবনের সব থেকে বড় ধাক্কা, সব থেকে বড় ট্রাজেডি। মনে হচ্ছিল আমার চারিদিকে আলো নিভে গেছে, হাঁটার পথ ফুরিয়ে গেছে, কোন আশার আলো যেন  আর জ্বলবে না। আরেকবার মনে হচ্ছিল আমার মেয়ে আমার মায়ের  রিপ্লেসমেন্ট কিন্তু পার্থক্য একটাই আমার মা আমাকে আদর করত আর এখন আমি তাকে আদর করবো।পৃথিবীতে হয়তো  এভাবেই মামত্ববোধ, ভালোবাসা আর সম্পর্কের রিপ্লেসমেন্ট হয়।

চারিদিকে হাহাকার, কান্নার রোল, মহামারীর নানান ঘটনা,প্রতিদিন  অসংখ্য মৃত্যুর সংবাদ আর কঠোর হতে কঠোরতা সময়ের নির্মমতার এক বিশাল সমাহার। দেখতে দেখতে কয়েক মাস পেরিয়ে গেল, করোনার প্রকোপ বাড়ছে। কখনো অফিস  খুলে, কখনো আবার বাসা থেকে হোম অফিস করতে হয়। এভাবে কেটে গেল কয়েক মাস। শরীর কিছুটা সুস্থ হতে না হতেই, ২০২১ সাল আমার হঠাৎ করেই তলপেটে ব্যথা হয়, তড়িগড়ি  করে ডাক্তারের কাছে যাই ডাক্তার ভালোভাবে চেকআপ করে আমাকে জানায় হার্নিয়া হয়েছে অপারেশন   করতে হবে। সামান্য বেতনের চাকরি দিয়ে সন্তান স্ত্রী আর নিজের নানান খরচ মিটিয়ে জীবনযাপন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছিল। ঢাকা থেকে ফ্যামিলি নিয়ে গ্রামে আসলাম, আমার এমন  বিপদের সময়ে আমার স্বজনদের যেন একটা অজানা নাম না জানা পৈষাচিক আনন্দ চোখে মুখে বেশি থাকতে দেখলাম। তাদের কাউকে বুঝতে দিলাম না,  শুধু নিজের চোখের জলের সাথে বিনিময় করলাম। একটা সময় মনে হল  এটাই আমার আসল জীবনের শুরু, এতদিন যে জীবন ছিল সেটা ছিল মোহ, মায়া আর আবেগের জীবন। এখন আমি  বাস্তবতার মধ্যে আছি। এটাই সত্য জীবন।

কাছের মানুষগুলোর থেকে নিন্দা, নানা প্রকার অযৌক্তিক কথাবার্তা  আর তাদের বৈরি

No comments:

Post a Comment

Thanks for your comment